সোমবার১৫ই এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ৬ই শাওয়াল, ১৪৪৫ হিজরি২রা বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

শবে বরাতের আমল ও ফজিলত

পবিত্র রমজান যথার্থভাবে পালনের জন্য দুই মাস আগে থেকেই এর প্রস্তুতি শুরু হয়। রজব ও শাবান এই দুই মাস রমজানের প্রস্তুতির মাস। মহানবী হুজুর পাক (সা.)-এর জীবদ্দশায় রমজান যতই ঘনিয়ে আসত, তা নিয়ে আলোচনা ও আমলের মাত্রা ততই বেড়ে যেত এবং তিনি সাহাবিদের রমজানের প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দিতেন।

শবে বরাত, অর্থাৎ মধ্য শাবান থেকে সাহাবিদের কাজকর্ম ও আমলে রমজানের পূর্ণ আমেজ এসে যেত। কাজেই শবে বরাত রমজানের আগমনী বার্তা হিসেবে আগমন করে।

শবে বরাত পরিচিতি

শাবান মাসের ১৫ তারিখের রাত (১৪ তারিখ দিবাগত রাত) হলো পবিত্র শবে বরাত। ফারসি ভাষায় শব অর্থ রাত এবং বরাত অর্থ মুক্তি। শবে বরাত অর্থ মুক্তির রাত। এই রাতে মহান আল্লাহ মুক্তি ও মাগফিরাতের দুয়ার খুলে দেন। সৃষ্টিকুলের প্রতি রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও হিংসুক ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন। এটি নিঃসন্দেহে বরকতময় রাত। রাতটি শাবান মাসের মধ্যবর্তী হিসেবে হাদিসে এই রাতকে লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান তথা অর্ধ শাবানের রাত বলা হয়েছে।
হাদিসের আলোকে শবে বরাত;

মুআজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা অর্ধ শাবানের রাতে সৃষ্টিকুলের প্রতি রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও হিংসুক ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৫৬৬৫; আল-মুজামুল আওসাত, হাদিস: ৬৭৭৬; শুআবুল ইমান, হাদিস: ৩৮৩৩; মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদিস: ১৩০৬) হাদিসটি হাদিসবিশারদ নির্ভরযোগ্য সব আলেমের গবেষণা মতেই ‘সহিহ’ তথা সর্বোচ্চ মাত্রায় সঠিকভাবে প্রমাণিত।

এ ছাড়া গ্রহণযোগ্য তাফসির গ্রন্থে শবে বরাত প্রসঙ্গ আলোচিত হয়েছে। হাদিসের বিশুদ্ধ ছয় কিতাবের অন্যতম দুই কিতাব তিরমিজি ও ইবনে মাজাহয় ‘অর্ধ শাবানের রাত’ শীর্ষক শিরোনাম দিয়ে এ বিষয়ের হাদিসগুলো উল্লেখ করা হয়েছে।

শবে বরাতের ফজিলত
শবে বরাত রহমত ও মুক্তির এক মহিমান্বিত রাত। এই রাতে মহান আল্লাহ রহমতের দুয়ার খুলে দেন। পাপীদের উদারচিত্তে ক্ষমা করেন। আল্লাহর সঙ্গে অংশীদারি স্থাপনকারী ও অন্তরে বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন। আলি ইবনে আবি তালিব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যখন অর্ধ শাবানের রাত তোমাদের সামনে আসে, তখন তোমরা নামাজ আদায় করো এবং পরের দিনে রোজা রাখো। আল্লাহ তাআলা এ রাতে সূর্যাস্তের পর প্রথম আসমানে অবতরণ করেন। এরপর তিনি এই বলে ডাকতে থাকেন—তোমাদের মধ্যে আছে কি কোনো ক্ষমাপ্রার্থনাকারী? আমি তাকে ক্ষমা করে দেব। তোমাদের মধ্যে আছে কি কোনো রিজিক অন্বেষণকারী? আমি তাকে রিজিক দান করব। তোমাদের মধ্যে আছে কি কোনো বিপদগ্রস্ত? আমি তার বিপদ দূর করে দেব। ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত এভাবেই চলতে থাকে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৩৮৮)

শবে বরাতের আরেকটি তাৎপর্য হলো, এই রাতে সৃষ্টিজগতের ভাগ্য বণ্টন করা হয়। মানুষের ভাগ্য নির্ধারিত, যা পৃথিবী সৃষ্টির ৫০ হাজার বছর আগেই নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এ রাতে এক বছরেরটি প্রকাশ করা হয়। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তুমি কি জানো, অর্ধ শাবানের রাতের কার্যক্রম কী?’ আয়েশা (রা.) বললেন, ‘না, হে আল্লাহর রাসুল।’ নবী (সা.) বললেন, ‘এ বছর যতজন সন্তান জন্মগ্রহণ করবে এবং মারা যাবে তা লিপিবদ্ধ করা হয়। এ রাতেই মানুষের আমল পৌঁছানো হয় এবং এ রাতেই তাদের রিজিক অবতীর্ণ হয়।’ (মিশকাত: ১৩০৫)

অন্য হাদিসে এসেছে, আতা ইবনে ইয়াসার (রহ.) থেকে বর্ণিত, শাবানের ১৫তম রাতে মৃতদের তালিকা (মৃত্যুর দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতার কাছে) দেওয়া হয়। এমনকি কোনো লোক সফরে বের হয়, অথচ তাকে জীবিতদের তালিকা থেকে মৃতদের তালিকায় স্থানান্তর করা হয়েছে। কেউ বিয়ে করে অথচ তাকে জীবিতদের তালিকা থেকে মৃতদের তালিকায় স্থানান্তর করা হয়েছে। (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক: ৭৯২৫)

শবে বরাতের আমল
এক. নফল ইবাদত: নামাজ আদায়, কোরআন তিলাওয়াত, তওবা, ইস্তিগফার ও ক্ষমাপ্রার্থনা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে রাত কাটানো। শবে বরাতের সব আমলই নফল। আর নফল আমল নিজ নিজ ঘরে একাগ্রচিত্তে আদায় করাই উত্তম। দুই. রোজা আদায় করা: আলি ইবনে আবি তালিব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যখন অর্ধ শাবানের রাত তোমাদের সম্মুখে আসে, তখন তোমরা তাতে কিয়াম তথা নামাজ আদায় করো এবং পরবর্তী দিনটিতে রোজা রাখো।’ (ইবনে মাজাহ: ১৩৮৮) তিন. মৃতদের জন্য মাগফিরাত করা: আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, আমি এক রাতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে কাছে না পেয়ে খোঁজ করতে বের হলাম। হঠাৎ দেখলাম, তিনি বাকি কবরস্থানে আছেন। তিনি বললেন, ‘(হে আয়েশা) তোমার কি এ আশঙ্কা হয় যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল তোমার ওপর জুলুম করতে পারেন?’ আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আমার ধারণা হলো, আপনি অন্য কোনো স্ত্রীর কাছে গিয়েছেন।’ তিনি বললেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা অর্ধ শাবানের রাতে দুনিয়ার আকাশে আসেন এবং কালব গোত্রের ছাগল-ভেড়ার পশমের চেয়েও অধিকসংখ্যক লোককে ক্ষমা করে দেন।’ (তিরমিজি: ৭৩৯; ইবনে মাজাহ: ১৩৮৯)

লেখক: ড. আবু সালেহ মুহাম্মদ তোহা সহযোগী অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়